আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

ইসলামে শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি পুত্রবধূর দায়িত্ব

বউ শ্বাশুড়ি সম্পর্ক

বউ শ্বাশুড়ির মধুর সম্পর্ক


হাফেজ মাওলানা আবদুল কুদ্দুস

আল্লাহতায়ালা ইবাদতের পরই মাতা-পিতার হক আদায়ের ব্যাপারে কোরআন ও হাদিসে গুরুত্ব প্রদান করেছেন। মাতা-পিতা বলতে আমরা বুঝি, যারা আমাদের জন্মদাতা মা-বাবা। এই মা-বাবা কারও জন্য শ্বশুর-শাশুড়ি আবার কারও জন্য নিজের মাতা-পিতা। একজন মেয়ের বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে স্বামীর পর যাকে সবচেয়ে বেশি কাছে পায়, তারা হলেন শ্বশুর-শাশুড়ি। স্বামী আয়-রোজগারে কোনো চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যে যখন বাইরে থাকেন, তখন বউকে সঙ্গ দেওয়ার একমাত্র ব্যক্তি হলেন শ্বশুর-শাশুড়ি। সংসারে আত্মীয়-স্বজন, ননদ-ভাবি, দেবর-ভাশুর এরা থাকলেও তাদের সময় সংক্ষিপ্ত। কিন্তু একজন নতুন বউ যখন কন্যা থেকে মা হন অর্থাৎ সন্তান প্রসব করেন, তখন তার মা-বাবার পরই কাছে পাওয়া যায় শ্বশুর-শাশুড়িকে। তারাই তার সন্তানকে কোলে-পিঠে মানুষ করেন। হাত ধরে স্কুল-মাদ্রাসায় নিয়ে যান। নাতি-নাতনির কোনো অসুখ-বিসুখ হলে দাদা-দাদি, নানা-নানি চিন্তায় পড়ে যান। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাই এই শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি অবহেলা না করে আমাদের সমাজে যারা পুত্রবধূ, বউমা তাদের উচিত, মা-বাবার মতোই তাদের সেবা-যত্ন করা। কারণ সেবা করার ব্যাপারে মহান আল্লাহতায়ালা কোরআনুল কারিমে এরশাদ করেন :কোনো মুমিন নারী-পুরুষ যখন নেক আমল করবে, আল্লাহতায়ালা তাদের প্রতি খুশি হয়ে সুখী জীবন দান করবেন এবং তাদের কৃত সৎকর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার দান করবেন (সুরা আন নহল, আয়াত :৯৭)।
বিষয়টি এমনও হতে পারে যে, বউ তার শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি ইহসান করবে, তার বাবা-মায়ের প্রতিও তার আপন ভাইয়ের বউ ইহসান করবে। কেননা আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তুমি মানুষের প্রতি দয়া করো, আল্লাহও তোমার প্রতি দয়া করবেন।’ এখানে ইহসান বলতে শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করা বোঝায়। বিশেষ করে তারা যখন বয়োবৃদ্ধ হন, তখন তাদের সঠিক সময়ে খাবারের ব্যবস্থা করা। ওষুধপত্র এগিয়ে দেওয়া। গোসলের ব্যবস্থা করা। কাপড়-চোপড় পরিস্কার করে দেওয়া। কোনো কোনো শ্বশুর-শাশুড়ি অসুস্থতার কারণে অবস্থা এমনও হতে পারে যে, বিছানায় প্রস্রাব-পায়খানা করেন, সে ক্ষেত্রেও তাদের প্রতি অবহেলা না করে সেবা-শুশ্রূষা চালিয়ে যাওয়া। এসব কাজের জন্য দুনিয়ায় তাদের পক্ষ থেকে কোনো উপহার, উপঢৌকন বিনিময়ে না পেলেও আখিরাতে পাওয়া যাবে। মনে মনে সে নিয়তকে সহিহ করে নিতে হবে।
আমাদের সমাজে শ্বশুর-শাশুড়ি একজন পুত্রবধূকে যে দৃষ্টিতে দেখেন, তা চরম হতাশাজনক। আমাদের অনেক পরিবার পুত্রবধূকে কাজের মেয়ের মতোই মনে করে। এটি কোনোভাবেই ঠিক না। কারণ যে মেয়েটি তার বাবা-মাকে ছেড়ে সারা জীবনের জন্য স্বামীর বাড়িতে চলে এলো। তার আপন ঠিকানা তখন স্বামীর বাড়িই। তাই আমাদের শ্বশুর-শাশুড়ি যারা তাদের উচিত, পুত্রবধূকে অবহেলা না করে, নির্যাতন না করে নিজের মেয়ের মতো মনে করা। এই শ্বশুর-শাশুড়িই কারও বাবা-মা। তাদের সংসারের মেয়েটি হয়তো অন্য ঘরের পুত্রবধূ বা বউমা। আপনি আপনার মেয়ের প্রতি, আপনার মেয়ের জামাতা ও তার শ্বশুর-শাশুড়ির পক্ষ থেকে যে ধরনের আচার-আচরণ আশা করেন; আপনারও উচিত, আপনার পুত্রবধূর সঙ্গে সেরূপ আচরণ করা। একসঙ্গে খাবার গ্রহণ করা। অসুখ-বিসুখে খোঁজখবর নেওয়া। তার পাশে থাকা। কোথাও ঘুরতে গেলে পুত্রবধূকে সঙ্গে নেওয়া। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে, বিয়ে-শাদিতে বউমাকেও সঙ্গে রাখা। মোদ্দা কথা হলো, একজন পুত্রবধূ বা বউমা প্রতিটি পরিবারেই অবিচ্ছেদ্য অংশ। এরা বাইরের কেউ নন। আসুন, এখন থেকে আমাদের সমাজের এসব বৈষম্য, কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলি। নিজ থেকে ওপরের বর্ণিত আচরণ পরিবর্তনের চেষ্টা করি। নিজ থেকে উদ্যোগী হই। অপরজনকে ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করি।
পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরির আরও দেখুন