আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন যখন পৃূর্ণ..

মোঃ ওয়ারেস আলী, বিশেষ প্রতিনিধিঃ
বাংলাদেশের নাগরিকদের বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন দেখা একযুগ আগেও যেন নিষিদ্ধ ছিল, বিশেষ করে বিশ্বে প্রায় অপরিচিত সবুজ পাসপোর্টে। গুটিকয়েক দেশ ভ্রমণ যদিও বা বাংলাদেশের মতন রক্ষণশীল দেশের পুরুষদের জন্য সম্ভব হলেও, ১০০’র উপর দেশ ভ্রমণ সত্যিই এক চ্যালেন্জিং ব্যাপার। এমনই একটি দুর্বোধ্য ও কঠিন কাজকে জয় করে বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্টকে বিশ্বের দরবারে চিনিয়েছেন কাজী আসমা আজমেরী। অন্যান্য ভ্রমণকারীদের সাথে আসমার পার্থক্য তিনি শুধু বাংলাদেশের মত দুর্বল পাসপোর্টেই বিশ্বের ১১৫ টি দেশ ভ্রমণ করেছেন, যার ভিতর কিছু দেশ রয়েছে যেখানে বাংলাদেশের পাসপোর্টে ভিসা প্রাপ্তি প্রায় অসম্ভব।
বাংলাদেশের গর্ব কাজী আসমা আজমেরীর বিশ্বভ্রমণের সূচনাটা হয়েছিল মূলত ঝোঁকের বসে। ২০০৯ সালের তারই এক বন্ধুর মা মন্তব্যটা করেছিলেন “বাংলাদেশের মেয়েরা একা বিদেশ ভ্রমণ করতে পারে না, বিশ্বভ্রমণ তো অসম্ভব”, যেটিকে নিজের ও বাংলদেশের মেয়েদের জন্য অপমানজনক বলে মনে করেছিলেন। একদিকে ক্ষোভ আর অন্যদিকে স্বপ্নপূরণের প্রত্যয়ে আজমেরী নিজের গয়না ও অলংকার বিক্রি করে শুরু করেন বিশ্বভ্রমণ সেই ২০০৯ সালেই। বিগত ১১ বছরে আসমা বিশ্বের ১১৫টি দেশ ভ্রমণ করে যেমন পরিচিত করেছেন বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্টকে, তেমনি মুখোমুখি হয়েছেন তিক্ত অভিজ্ঞতার।
প্লেনের রিটার্ন টিকেট না থাকা ও বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী হওয়ার কারণে কাজী আসমা ২০১০ সালে যখন ভিয়েতনাম ভ্রমণ করতে যান, তখন ভিয়েতনাম ইমিগ্রেশন কর্তৃক অনর্থক জেল খাটেন ২৩ ঘন্টা। একই ঘটনার পুনরাবৃতি ঘটে যখন তিনি সাইপ্রাসে ভ্রমণে যান, যেখানে তিনি অসৌজন্যমূলক ব্যবহারের মুখোমুখি হন এবং ২৭ ঘন্টা সেখানকার ইমিগ্রেশন জেলে সময় কাটান শুধুমাত্র বাংলাদেশী পাসপোর্ট হওয়ায়। মূলত তখনই তার মনে দারুণ ক্ষোভর জন্ম নেয়, সেই থেকে প্রতিজ্ঞা করেন বাংলাদেশী পাসপোর্টে বিশ্ব ভ্রমণ করবেন। প্রথম ট্যুর যদিও শুরু করেন এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড থেকে, এরপরে গিয়েছেন ভারত, নেপাল, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। ধীরে ধীরে আজমেরী হয়ে উঠেন একজন ভ্রমণপিপাসু, যার লক্ষ্য হয়ে উঠে বিশ্বের সব দেশ ভ্রমণ করে বিশ্বকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট এর এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর।
২০১২ সাল থেকে যদিও কর্মসূত্রে নিউজিল্যান্ডে বসবাস করছেন, কিন্তু ধরে রেখেছেন বাংলাদেশী সবুজ পাসপোর্ট যা তার নিজের ও প্রিয় জন্মভূমির অস্তিত্ব, স্বকীয়তা ও পরিচয় বহন করছে । ২০১৪ সালে ফিফা বিশ্বকাপের সময় তার ৫০তম দেশ হিসেবে ব্রাজিল ভ্রমণের সময় বিশ্ব পর্যটক হিসেবে ‘ভয়েস অফ আমেরিকার’ নজরে আসেন, তবে বরাবরের মতোই মিডিয়াকে এড়িয়ে চলেছেন। যদিও বাণিজ্যিকভাবে বিশ্ব পর্যটক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে খুব একটা পছন্দ করেন না, তারপরও দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে টিভি-রেডিও সবখানেই বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করেছেন ও উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছেন বাংলাদেশি ভ্রমণপ্রিয়দের।
বিবিসি বাংলা থেকে শুরু করে চায়না রেডিও, জার্মানির ব্রায়ান্ ২, সুইডেনের লোকাল রেডিও, উজবেকিস্তানের টিভি, রাশিয়া নিউজ পেপার, তুর্কেমেনিস্তানের ন্যাশনাল টিভি, নিউজ পেপারে তার ১০০টি দেশ ভ্রমণের উপর বিভিন্ন প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও রয়েছে বিশ্ব ভ্রমণকারী হিসেবে পরিচিতি। ২০১৮ সাল থেকে বিশ্বভ্রমণের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটি ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে ভ্রমণের গল্প বলার মাধ্যমে ‘ইয়ুথ জেনারেশন’ কে “Travelling is fun way to learn” প্রোগ্রামের আওতায় ভ্রমণে আগ্রহী, স্বপ্ন দেখা ও আত্মবিশ্বাসী করার প্রচেষ্টায় এক লক্ষ স্টুডেন্টদের 2020 সালের 25 শে ডিসেম্বর অনুপ্রাণিত কাজ শেষ করবেন চিন্তা করেছিলেন কিন্তু করোনাভাইরাস এর দরুন তার সম্ভব হয়নি মাত্র 29 হাজার 886 স্টুডেন্টদের তার গল্প শোনাতে পেরেছিলেন সরাসরি তাদের স্কুল-কলেজে। এখনো স্বপ্ন দেখেন তাঁর এই স্বপ্ন পূর্ণ করবেন 50 বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার।
তরুণ তরুণীদের বিশ্ব ভ্রমণে উৎসাহ দেয়ার পাশাপাশি কাজী আসমা আজমেরী ২০১০ সাল থেকে ভুয়া স্টুডেন্ট – টুরিস্ট ভিসায় বিদেশে থেকে যাওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করতে ও অবৈধ ভাবে শ্রম অভিবাসনের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছেন। এ গল্পের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত করতে কাজ শেষ করবেন। ইতিমধ্যে ফিলিপিন, মঙ্গোলিয়া, রাশিয়া, উজবেকিস্তান, পর্তুগাল, জর্জিয়া ও ইন্ডিয়া বিভিন্ন স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে গিয়েছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের খেটে খাওয়া মানুষ যেমন: রিক্সাওয়ালা, কাজের বুয়া ও দারোয়ানদের অধিকার ও মানুষ হিসেবে তাদেরকে সাম্যতা ও তাদের প্রতি মানবিক হওয়ার জন্য মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছেন। ছোটবেলা থেকে সন্ধানী ডোনার ক্লাব, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল এর সাথে জড়িত আছেন। রোটারি ইন্টারন্যাশনাল এর রোটারিয়ান হিসেবে এ পর্যন্ত ৫২ টি দেশ ভ্রমণ করেছেন।কোভিড-১৯ মহামারীর ক্রান্তিলগ্নে তিনি সমাজের খেটেখাওয়া ও সবচেয়ে দুঃস্থদের মাঝে 500 টি পরিবারের ত্রাণ বিতরণ ও করেছেন নিজ উদ্দ্যোগে। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থেকে ভ্রমণকারীদের ভ্রমণ বিষয়ে বিভিন্ন টিপস ও দিকনির্দেশনা দেয়ার পাশাপাশি একজন মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবেও সমান জনপ্রিয় আসমা তরুণ তরুণীদের কাছে।
কাজী আসমা নিউজিল্যান্ডে বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান যেমন: রিয়েল এস্টেট, স্টক এক্সচেঞ্জ,ও রেডক্রসের মত ইন্টারন্যাশনাল সংস্থাতে চাকরি করেছেন এবং তার পাশাপাশি নিজস্ব ইনভেস্টমেন্টে ব্যবসা ও করেন। নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে তিনি শুধু নিজেই ভ্রমণ করেন না, বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট-এর মানুষর ভ্রমণের পথকে সুগম করারও চেষ্টা করছেন। অদম্য উৎসাহ ও আত্মপ্রত্যয় হয়তো অচিরেই আসমা বিশ্বের ২০০ দেশ ভ্রমণ করে বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্টকে নিয়ে যাবেন এক অনন্য উচ্চতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরির আরও দেখুন