আজ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

ডাক্তার বনাম ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ

ঘটনা একঃ
আমার শশুর মহাশয় শ্রদ্ধেয় বলরাম বিশ্বাস তখন তরুণ অধ্যাপক। আমার তখনো বিয়ে হয়নি, আমি তাঁর নিকট বেড়াতে গিয়েছি। একদিন বিকেলবেলা একজন ছাত্র প্রায় এক দিস্তে সার্টিফিকেটের ফটোকপি নিয়ে এসেছে তাঁর কাছে সত্যায়িত করাতে। তিনি কিছু না দেখে এক প্রকার ‘চোখ বুজে’ সত্যায়িত করে দিলেন। আমি তাঁকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করাতে, তিনি বললেন পৃথিবীতে সবকিছু খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখতে গেলে তুমি ঠিকমতো চলতে পারবে না; একজন মানুষের সিক্সথ সেন্স থাকা জরুরী। তুমি প্রতি পদক্ষেপে পায়ের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে চাইলে তুমি সবার পিছনে পড়ে থাকবে। তোমার দূরদৃষ্টি এবং ধারণাটা হলো আসল।
 
ঘটনা দুইঃ
আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবে মাত্র পাশ করেছি, ফার্মগেট থাকি। কিছু কাগজপত্র সত্যায়িত করানোর জন্য গেছি আমার এক বন্ধুর বন্ধু, তার খালাতো ভাই এক ডাক্তারের কাছে। প্রায় দু’ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকলাম- এরপর তিনি ডাকলেন, প্রতিটি কাগজের মূল কপি যাচাই-বাঁচাই করে সত্যায়িত করতে লাগলেন। ছবি সত্যায়িত করানোর সময় তিনি আমার মুখের দিকে তাকালেন। মাঝপথে দেখা দিলো এক বিপত্তি- একটি সার্টিফিকেটর মূল কপি আনা হয়নি, সেটি তিনি সত্যায়িত করবেন না। আমি অনেক বুঝিয়ে বললাম “দাদা, এই একটি সার্টিফিকেটতো, হয়তো ভুলে আনা হয়নি, আর সব মূল কপিতো এনেছি, একটু করে দিন।” আমার কথাতে তিনি ক্ষেপে গেলেন- চিৎকার করে আমাকে ধমক দিতে দিতে আমার সব কাগজ ও ফাইলপত্র ছুঁড়ে দিলেন দশহাত দূরে মাটিতে। আমি সিনেমার পিতৃ-মাতৃহীন সেই অসহায় নায়কের মতো চোখের জল মুছতে মুছতে চলে এলাম।
মনে-মনে ভাবলাম- হায় দুর্ভাগা জাতি! প্রাগুক্ত অধ্যাপকও একজন কর্মকর্তা আর শেষেক্তো ডাক্তারও একজন কর্মকর্তা! অথচ দু’জন কর্মকর্তার কি বিপরীতমুখী আচরণ! জীবনে অ্যাসেসমেন্ট জিনিসটি যে কতো জরুরী তাই চিন্তা করলাম।
 
এবার আসি আসল কথায় ডাঃ সাঈদা শওকত জেনি বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলীর কন্যা। তিনি নিজেও একজন বড় ডাক্তার। বেশ! দেশের এই সংকটময় জরুরী মূহুর্তে একজন ডাক্তার আমাদের দ্বিতীয় ঈশ্বরের মতো। আমরা তাঁদের সেলুট জানাই। কিন্তু একি করলেন তিনি? এতো সিনিয়র একজন মানুষ হয়ে ‘ছোট একটি বিষয়’ যা সহজেই সমাধান করা যেতো, তা তিনি টেনে-টুনে, তেলে-বেলে এতো বড় করলেন কেন? একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখলে- বিষয়টিতো তাঁর এবং তাঁর পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধারও  মান-ইচ্ছতের বিষয়। এ প্রসঙ্গে বাবার মুখে শোনা একটি গল্প বলি- আমাদের এলাকার দশ গ্রামের মাতব্বর ছিলেন শশী ভাংড়া। তিনি পাশের এলাকার একটি গঞ্জে গেছেন একটি কাজে। সেখানকার এক ছোট মাতব্বর কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে ইর্ষাপন্বিত হয়ে শশী ভাংড়াকে অপমান করে। এ কথা গ্রামে রটে গেলে হাজার হাজার মানুষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাকে উদ্ধার করতে যায়। প্রতিপক্ষরা ভয় পেয়ে পালিয়ে যায় এবং হাট-বাজার ভাঙচুর করতে উদ্যত হয়। নিজ গ্রামের লোক গ্রামের শশী ভাংড়াকে জিজ্ঞেস করলে, তিনি সবাইকে শান্ত হতে বলেন এবং সবার উদ্দেশ্যে বলেন- আমি তোদের বড় ভাই, কার এমন সাধ্য আছে আমাকে অপমান করে? সবাই এক কথায় শান্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ তিনি নিজের সম্মান এবং দুই এলাকার বড় দাঙ্গা এড়াতে তার নিজের অপমান হজম করার মতো ছোট একটি কৌশল অবলম্বন করেছেন। ডাঃ মহোদয়, ‘পুলিশ বড়, না ডাক্তার বড়’ এ ধরনের কথা না বলে; আঙুল উঁচিয়ে অহংকার না দেখিয়ে; নিজ তথা জাতির ও দেশের স্বার্থে এরকম ছোট একটি কৌশল অবলম্বন করতে কি  পারতেন না? ঘটনা দেখে আমাদের মোটেই মনে হলো না, আমরা এখন এক মৃত্যু উপত্যকায় বসবাস করছি। হায় রে মানুষ! হায় রে মানবিকতা!
 
এবার আসি পুলিশ ও ম্যাজিট্রেটের প্রসঙ্গে। আমার শশুর মহাশয় ‘চোখ বুজে’ প্রায় এক দিস্তা কাগজ সত্যায়িত করে দিলেন, অপরপক্ষে অন্য একজন ডাক্তার অহংকারে আমার সার্টিফিকেট ছুড়ে মাড়লেন; জীবন চলার জন্য এটি হলো একটি এজাম্পশন। পথ চলতে গেলে আমাকে পাই টু পাই, ইঞ্চি-ইঞ্চি আইন মেপে চললে হবে না, কিছু জিনিস আমাকে আগে থেকে গেজ করতে হবে, এটাই মৌলিক শিক্ষা। পুলিশ এবং ম্যাজিট্রেট আপনারা দেশের সবচেয়ে মেধাবীদের দলে; আপনারাও তো বুঝতে পেরেছিলেন উনি একজন ডাক্তার, সবকিছু সবসময় কি প্রমান দেখাতে হবে? আর এতোগুলো অফিসারের মধ্য থেকে যদি  আপনারা কেউ সেটি না বুঝে থাকেন তবে অফিসার হিসেবে আপনারা কতটুকু যোগ্য? ইগো বোধ রেখে একজন ‘অফিসার’ হওয়া যায়, একজন ‘পরিপূর্ণ অফিসার’ হওয়া যায় না। এই কঠোর লকডাউনে আপনি যে কাউকে থামাতেই পারেন, চেক করতে পারেন, তার আইডি যাচাই করতেই পারেন, কিন্তু আপনি যদি বুঝতেই পারেন তিনি সত্যিকারের একজন ডাক্তার, তবে ঘটনাটি নিয়ে আরো একটু ট্যাক্টফুল বা সহনশীল হওয়া কি যেতো না?
 
আমি এর পূর্বেও একটি লেখাতে বলেছিলাম- আমাদের দেশে প্রতি শ্রেণীতে একটি সাবজেক্ট বাধ্যতামূলক থাকা উচিত আর তা হলো “ধৈর্য্য ও নীতিবিদ্যা”। এছাড়া দেশের সব কর্মকর্তাদের বেসিক ট্রেনিংকালে এ বিষয়টি হাতে-কলমে শেখানো উচিত। এটি হলে আমাদের আর বারবার এসব পাগলের খেলা দেখতে হতো না, আমাদের আর গাইতে হতো না- “হরেক রকম পাগল দিয়া মিলাইছে মেলা/ বাবা তোমার দরবারে সব পাগলের খেলা।” আর শুনতে হতো না কে কার চেয়ে বড়। আমার ক্লাসমেট বন্ধু উপসচিব  শওকত আলীর Mohammad Showkat Ali  ওয়ালে একটি লেখা পড়েছিলাম- দেশের সবাই লটারিতে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা পেয়েছে। সবাই ধনী হয়ে গেছে। টাকা পেয়ে যার যার কাজ সবাই ছেড়ে দিয়েছে। কৃষক ফসল ফলায় না, জেলে মাছ ধরে না, তাঁতি কাপড় বোনে না, চালক গাড়ি চালায় না, নাপিত চুল কাটে না, মেথর ময়লা ফেলে না। এর ফলে খাবারের অভাবে বিশাল দুর্ভিক্ষ, বিশাল নৈরাজ্য। টাকা আছে কিন্তু কারো খাবার নেই। পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দিয়েও একমুঠো খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। মানুষ মরে সয়লাব! এ প্রসঙ্গে একটি কবিতার ক’টি লাইন মনে পড়ে গেল:
যখন-
“শেষগাছটি কেটে ফেলা হবে
শেষ মাছটি খেয়ে ফেলা হবে
শেষ জলধারাটি বিষাক্ত হবে
তখন তুমি বুঝতে টাকা খাওয়া যায় না।”
 
সুতরাং আমাদের বুঝতে হবে ব্রহ্মাণ্ডের এই ইকো সিস্টেমে, স্রষ্টার সৃষ্টিতে কোন মানুষ, কোন জীবজন্তু বা কোন পোকা-মাকড় ছোট নয়, সবার গুরুত্ব অপরিসীম। ফল ফলাতে যেমন মৌমাছির পরাগায়ন লাগে, তেমনি ফসল ফলাতে কৃষকের ঘাম লাগে। আপনার-আমার পেট ভরাতে যেমন অসংখ্য মানুষ খাটে; তেমনি আপনাকে আমাকে সুন্দর করতে, আরাম দিতে হাজারো মানুষের পরিশ্রম জড়িত। ডাক্তার সাহেবকে যেমন বলি, তেমনি ম্যাজিট্রেট ও পুলিশ সাহেবসহ সবাইকে বলি- আমাদের আরো সহনশীল হওয়া উচিত। ‘মেরেছিস কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেব না।’ মনে রাখতে হবে- চোখের বদলে চোখ নিলে, পৃথিবী একদিন অন্ধ হয়ে যাবে। আমাদের পৃথিবী আমাদের ভালোবাসতে হবে, ভালোবাসতে হবে এর স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে। মনে পড়ে গেল বিখ্যাত ইংলিশ কবি ও লেখক  S.T Coleridge  এর বিখ্যাত ক’টি লাইন-
“He prayeth best, who loveth best
All things both great and small;
For the dear God who loveth us,
He made and loveth all.”
 
লেখকের ফেসবুক হতে সংগৃহিত

Comments are closed.

     এই ক্যাটাগরির আরও দেখুন