আজ ৪ঠা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১৮ই জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

শামসুজ্জামান খান: ফোক সাধনার নিবেদিতপ্রাণ

শামসুজ্জামান খানের বড়ো গুণ হলো তিনি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সৃষ্টিশীল ছিলেন। তিনি চিন্তক ছিলেন, লেখক ছিলেন, কর্মবীর ছিলেন। মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজের প্রভাষক ছিলেন, বাংদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার সহকারী অধ্যাপক ছিলেন, সেখান থেকে বাংলা একাডেমিতে আসেন উপপরিচালক হিসেবে। তিনি আমাকেও দৈনিক পত্রিকা থেকে ডেকে এনে উপপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। যোগদানের পর দেখা করতে গেলে বলেন, শোনো মিয়া, আমার আগে বাংলা একাডেমিতে কেউ উপপরিচালক হিসেবে সরাসরি যোগ দেয়নি। আমার পরে তুমি আর সুলতান সরাসরি উপপরিচালক হয়েছো’। বললাম, ‘স্যার এটা আপনার উদারতা’। বাংলা একাডেমিতে তিনি পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। অবসরের আগেই তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে মহাপরিচালক (১৯৯৬-৯৭) হিসেবে কাজ করেন। সেখান থেকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক (১৯৯৭-২০০১)। এরপর নিজের প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমিতে মহাপরিচালক হিসেবে (২০০৯-২০১৮)। শামসুজ্জামান খানই এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে দীর্ঘকাল মহপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সঙ্গতকারণে তাঁর অর্জনও অনেকের চেয়ে বেশি। তিনি বাংলা একাডেমিতে ৮জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নামে ৮টি স্থাপনার নামকরণ করেছেন—ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভবন, কবি জসীমউদ্দীন ভবন, ড. মুহম্মদ এনামুল হক ভবন, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তন, কবি শামসুর রাহমান সেমিনারকক্ষ, মুনীর চৌধুরী সভাকক্ষ, কবি আবদুল কাদির গবেষণাকক্ষ ও ভাস্কর নভেরা আহমেদ হল।
 
শামসুজ্জামান খান মহাপরিচালক থেকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হয়েছেন। তাঁর আগে মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ, কবি সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী এবং প্রফেসর মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ। এসকল প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ছিলেন। কিন্তু শামসুজ্জামান খানের পরিচয় হচ্ছে তাঁর মননচর্চার স্মারক প্রবন্ধ ও গবেষণা। আধুনিক সাহিত্যেরই গবেষক তিনি। মীর মশাররফ হোসেনকে নিয়ে তিনি অসুন্ধানী কিছু গবেষণা করেছেন। আবদুল করিম সহিত্যবিশারদ, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, চন্দ্রকুমার দে, জসীমউদ্দীন প্রমুখের ওপর তাঁর নিজস্ব মূল্যায়ন রয়েছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুকেও বিচার করেছেন তাঁর রচিত তিনটি গ্রন্থের ভিত্তিতে। ‘লেখক বঙ্গবন্ধু’কে নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন সঙ্গতকারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বঙ্গবন্ধুর হস্তলিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে সঠিক পাঠ নির্ণয় করে এই তিনটি গ্রন্থ রূপায়ণের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কেবল পাঠক হিসেবে নয়, সম্পাদক হিসেবে এবং গ্রন্থিত হওয়ার পরে সমালোচকের দৃষ্টিতে তিনি দেখেছেন বঙ্গবন্ধুর এই গ্রন্থত্রয়কে।
সকল পরিচয় ছাপিয়ে শামসুজ্জামান খানের ‘ফোকলোরবিদ’ পরিচয়টিই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে মুখ্য হয়ে। এর কারণ কী? তাঁর আগেও তো ফোকলোরচর্চা হয়েছে। বিশেষত প্রফেসর ড. মযহারুল ইসলাম ও প্রফেসর ড. আশরাফ সিদ্দিকী ফোকলোরবিদ্যায় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন। বাংলাদেশের ফোকলোরকে তাঁরা বহির্বিশ্বে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ফোকলোরের আধুনিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণেও তাঁদের দক্ষতা ছিল। এঁরা দুজনই আবার বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে শামসুজ্জামান খানের পূর্বসূরি। এঁরা ছাড়াও মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন, আবদুল হাফিজ, তোফায়েল আহমেদ, আতোয়ার রহমান, মনিরুজ্জামান, ওয়াকিল আহমদ, খোন্দকার রিয়াজুল হক, মোমেন চৌধুরী ছিলেন তাঁর সমকালের শীর্ষস্থানীয় ফোকলোরবিদ। তাঁর পরের প্রজন্মে মাহবুবুল হক, আবুল আহসান চৌধুরী, সাইফুদ্দীন চৌধুরী, মহসিন হোসাইন, স্বরোচিষ সরকার, শফিকুর রহমান চৌধুরী, আবুল হাসান চৌধুরী প্রমুখ ফোকলোরবিদ নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলছেন। ফোকলোরের প্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকে এগিয়ে নিতে বেশ কিছু সাহসী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। ফোকলোর বিভাগের পরিচালক হিসেবে তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফোকলোর কর্মশালা করেন বাংলা একাডেমিতে। এসব কর্মশালায়ে তিনি ফিনল্যান্ডের ফোকলোরবিদ লোরি হোংকো, মার্কিন ফোকলোরবিদ হেনরি গ্লাসি, ভারতীয় ফোকলোরবিদ জওহরলাল হান্ডু, ও পাকিস্তানি ফোকলোরবিদ আকসি মুফতি প্রমুখ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোকলোরবিদদের এনেছেন। মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পরে তিনি বেশ কয়েকটি কর্মশালা ও আন্তর্জাতিক ফোকলোর সামার স্কুলের আয়োজন করেছেন। এসব কর্মশালায় তাঁর আমন্ত্রণে এসেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ফোকলোরবিদ অধ্যাপক ফ্রাঙ্ক জে কোরম, ভারতের জহরলাল হান্ডু, সৌমেন সেন, সুখবিলাস বর্মা, জহর সরকার, অসীমানন্দ গঙ্গোপাধ্যায়, ড. শেখ মকবুল ইসলাম ও সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়, এবং শ্রীলঙ্কান ফোকলোরবিদ ড. লিয়ানেজ অমরাকীর্তি প্রমুখ ফোকলোরবিদ। শামসুজ্জামান খান চেয়েছিলেন একঝাঁক তরুণ ফোকলোরবিদ সৃষ্টি করতে। তিনি চেয়েছিলেন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোকলোরবিদ্যা একটি পাঠ্যবিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোকলোর বিভাগ প্রতিষ্ঠার পরে ওই বিভাগের কর্মকাণ্ডে তিনি নানাভাবে অবদান রেখেছেন। ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোকলোর বিভাগের সঙ্গেও তিনি আত্মিকভাবে যুক্ত ছিলেন। আর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফোকলোর বিভাগ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন অঙ্গাঙ্গীভাবে। ফোকলোরচর্চায় আধুনিক চিন্তার প্রবেশ ঘটে তাঁর হাতে। এসকল কারণে তিনি বাংলাদেশের ফোকলোরবিদদের মধ্যে শীর্ষ আসন লাভ করে আছেন।
 
বাংলা একাডেমিতে বুদ্ধিবৃত্তিক উত্কর্ষ সৃষ্টিতে তিনি বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ ও ব্যবহারিক বাংলা ব্যাকরণ প্রণয়নে তিনি সফলতা অর্জন করেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস গ্রন্থ প্রণয়ন, বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান প্রণয়ন, ৬৪টি খণ্ডে বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতির বিকাশ গ্রন্থমালা প্রণয়ন, জেলা পর্যায়ে আঞ্চলিক সাহিত্য সম্মেলন; ভাষা অন্দোলন জাদুঘর প্রতিষ্ঠা, জাতীয় সাহিত্য জাদুঘর ও জাতীয় লেখক জাদুঘর প্রতিষ্ঠা; বাংলা একাডেমি আর্কাইভস স্থাপন; বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস রচনা; খ্যাতনামা সাহিত্য-সংস্কৃতিসেবীদের রচনা সংগ্রহ ও প্রকাশ, রবীন্দ্র বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশ প্রভৃতি ক্ষেত্রে তিনি সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। ‘উত্তরািধিকার’ পত্রিকাটিকে তিনি নতুন রূপে গড়ে তুলেছিলেন। এইসব বহমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শামসুজ্জামান খান মূলত বাংলা ও বাঙালির সেবা করতে চেয়েছেন। তিনি বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয় সন্ধানে ব্রতী ছিলেন। বাঙালির হূদস্পন্দন ধ্বনিত হয় যে ফোকলোরে, তিনি ছিলেন তারই সাধক। এই মহান ফোকলোর সাধকের অবদান মানুষ চিরদিন স্মরণে রাখবে।
 
সৌজন্যে: দৈনিক ইত্তেফাক

Comments are closed.

     এই ক্যাটাগরির আরও দেখুন