আজ ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৩০শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর নাজেহাল অবস্থা।। স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত প্রত্যন্ত জণপদ

ফয়সাল আজম অপু, বিশেষ প্রতিনিধিঃ


চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে কমর্রত স্বাস্থ্য সেবাদানকারী ব্যক্তিদের স্বেচ্ছাচারিতায় জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে জনগণকে স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে।

এছাড়া ওষুধ সঙ্কটে পড়ে চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা। অনেক এলাকা থেকে স্থানীয় জনগণ অভিযোগ করেছেন ইদানীং খুবই অল্প সময়ের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো খুলে তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিয়ে যেনতেনভাবে চলছে সেগুলো। আবার যেটুকু সময় খুলছে তাও সেবাদানকারী বিশেষ করে নারীরা ক্লিনিকে তেমন থাকেন না।

যার ফলে স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে না জনগণ। স্বাস্থ্য সেবা সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ইউনিয়ন পর্যায়ে ছয় হাজার লোকের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করেছে সরকার। ক্লিনিকগুলো সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত খোলা রাখার কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যায় দুপুর ১২টার আগেই।

এদিকে জ্বর, মাথা ব্যাথা, ডায়রিয়াসহ বিনামূল্যে ৩১টি রোগের ওষুধ সরবরাহ করার কথা থাকলেও দেয়া হচ্ছে দুই-একটি রোগের ওষুধ। আর তালিকায় দেখা গেছে ২৭টি রোগের ওষুধ। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চিকিৎসার জন্য রোগীদের যেতে হচ্ছে অন্য ক্লিনিক বা হাসপাতালে। ফলে ভোগান্তির পাশাপাশি অতিরিক্ত টাকা গুণতে হচ্ছে রোগীদের।

চিকিৎসা নিতে আসা তানজিলা অভিযোগ করে বলেন, ‘জ্বর, মাথা ব্যাথা নিয়ে ক্লিনিকে ওষুধের জন্য এসেছি কিন্তু তারা বলছে এখানে ওষুধ নাই। তাই আমাকে এখন বাহির থেকে ওষুধ নিতে হবে।

অপরদিকে সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকেও চিকিৎসা বঞ্চিত চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নবাসী
সরকার প্রদত্ত বিভিন্ন চিকিৎসা সেবা বঞ্চিত চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষ। নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে নিয়মিত অফিস করেন না চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্টাফরা। রোগীদের সাথে র্দুব্যবহার, ক্লিনিক ভবন পরিষ্কার না করা, রোগীদের ওষুধপত্র না দিয়ে ফেরত পাঠানোসহ নানা অনিয়মের স্বাস্থ্য কেন্দ্রের দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে।

চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের কয়েক হাজার মানুষের চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালে স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু কাঙ্খিত সেবা পাচ্ছেন না ইউনিয়নবাসী। ফলে বাধ্য হয়েই ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসা সেবা নিতে যেতে হয় ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে। পদ্মা নদীর ভাঙ্গন কবলিত এলাকার এসব মানুষের আয় সামান্য হওয়ায় অনেকেই এতো দূরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন না। ফলে অসুস্থ ও অপুষ্টির কারনে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এই এলাকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য।

চরবাগডাঙ্গা কোটাপাড়া এলাকার ইউপি সদস্য এনামুল হকের ছেলে মো. জুয়েল বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ক্লিনিকে অনেক লোকের ভিড় দেখি। কিন্তু অনেকেই ওষুধ পায় না। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখি। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই খালি হাতে ফিরে যায়। কারন ওষুধপত্র ঠিকমতো দেয়া হয় না। এমনকি এখানকার উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার ও ইনচার্জ ডা. মো. আনোয়ারুল হক ও এমএলএস (পিয়ন) মো. ওবাইদুজ্জামান ঠিকমতো অফিস করেন না।

পঞ্চাশোর্ধ রহিমা বেগম জানান, লাইনে দাঁড়িয়ে ওষুধ নিতে গিয়ে ঘুরিয়ে পাঠায়। বলে বাইরে কিনে নাও। সরকারি ক্লিনিকে যদি ওষুধ না পায় তাহলে সরকার এটা কেন তৈরি করেছে? আমার তে মনে হয় তারা থাকার পরেও ওষুধ দেয় না। এখানকার ডাক্তার ও স্টাফরা খুবই খারাপ ব্যবহার করে।

স্থানীয় গৃহবধূ জমিলা বেগম বলেন, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ওষুধ না থাকলে বুঝিয়ে বললেই হয়। কিন্তু তারা রোগীদের সাথে চাকরের মতো আরচণ করে। ডাক্তারকে ঠিকমতো দেখাতে পারিনা। মুখে শুনেই ফার্মাসিস্ট দু-একটা ওষুধ দেয়। ডাক্তার অফিসে ঠিক মতো আসে না। আর বেলা ১১টায় আসলেও দুপুর ১টায় বাসায় চলে যায়। এতে দুপুর পর হঠাৎ কেউ কোন রোগে আক্রান্ত হলে আর উপায় থাকে না। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিয়ে যেতে হয় সদর হাসপাতালে।

তিনি আরো বলেন, যদি যেকোন ব্যাপারে হাসপাতাল নিয়ে যেতে হয়, তাহলে এতো টাকা দিয়ে সরকার বিল্ডিং আর এতোগুলো মানুষ রেখেছে কেন? তাদের কি কোন কাজ নেই? নাকি সরকারি চাকুরি বলে এভাবে দায়িত্বে অবহেলা করে তারা। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিনীত অনুরোধ, এই এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্লিনিকের কোন পরিবেশ নেই চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে। রোগী পরীক্ষার টেবিলে ঝাড়ু ও ময়লা পরিষ্কার করার জিনিসপত্র। ময়লা আর্বজনায় পরিপূর্ণ চারদিক। এবিষয়ে চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট মো.আব্দুল মোমিন বলেন, এখানকার এমএলএস (পিয়ন) ঠিকমতো অফিসে আসেন না। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ওষুধ না দেয়া ও ফেরত পাঠানোর বিষয়ে তিনি জানান, সরকারি ওষুধের যে বরাদ্দ তাতে ১৫-২০ দিন যায়। তাতেই এই সমস্যা। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি।

শনিবার বেলা ১১টায় চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে সেখানকার ইনচার্জ ডা. আনোয়ারুল হককে পাওয়া যায়নি। ফার্মাসিস্ট আব্দুল মোমিন জানান, আনোয়ারুল হক অফিসের কাজে শহরে গেছেন। স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সকল অভিযোগের বিষয়ে ইনচার্জ ডা. আনোয়ারুল হক বলেন, আমি নিয়মিত অফিস করি এবং এখানে কোন অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা হয় না। সঠিকভাবে সকল রোগীকে ওষুধ দেয়া হয়।

অপরদিকে গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর ইউনিয়নের হুক্কাপুর এলাকার রহীমা বেগমসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, আমাদের স্বরস্বতীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকটি অধিক সময় বন্ধ থাকে। এলাকার অসংখ্য নারী বলেছেন সেখানে পার্শ্ববর্তী কমিউনিটি ক্লিনিকটিই আমাদের একমাত্র ভরসা সেটিও বেশিরভাগ সময়ে বন্ধ থাকে।

ফলে বাচ্চাদের সর্দি-কাশিসহ নানান রোগ ও নারীদের নানা সমস্যা সংক্রান্ত রোগের জন্য তারা চিন্তিত। এমনকি অনেকে ঝুঁকি নিয়ে উপজেলা শহরের কোনো ফার্মেসি বা ডাক্তারের কাছে যাচ্ছেন।এলাকাবাসীর দাবি এই ক্লিনিকটি বর্তমানে ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। এরপর বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে এলাকাবাসীর বার বার এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১১টায় রহনপুর ইউনিয়নের স্বরস্বর্তীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে ক্লিনিকটি খোলা পাওয়া যায় । এ বিষয়ে পার্শ্ববর্তী এক নারীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, মূলত ক্লিনিকটি এভাবেই বেশীরভাগ সময়ই বন্ধ থাকে। তবে এজন্য অনেক রোগী এসে প্রতিদিন ফিরে যান। তাছাড়া রোগীদের সাথে ভালোভাবে ব্যবহার করেন না।এমন অভিযোগ নয়াদিয়াড়ী ও বোয়ালিয়া কমিনিউটি ক্লিনিকেও সরেজমিনে গিয়ে খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে জানতে স্বরস্বতীপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের হেলথ কেয়ার প্রভাইডার সাজেদা বেগম বলেন, নিয়মিত ক্লিনিকে আসা হয়। কিন্তু এই ক্লিনিকটির বিল্ডিং খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে আছে।আর আমার একটি ছোট বাচ্চা আছে।তাই ১২টার পরে চলে যায়। আর দুপুরের পর ক্লিনিকে রোগীর চাপ আসে না,তাই বন্ধ রাখা হয়। ওষুধ দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে, তিনি বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে ২৭ ধরনের ওষুধ সরবরাহ দেয়া হয়। এবং রোগীর চাপ বেশী থাকায় মাসের প্রথম দিকে ওষুধ শেষ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আর দিতে পারা যায় না।বিধেই রোগীদের ঘুরিয়ে পাঠাতে হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,উপজেলার ৩৩ ক্লিনিকের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বেশির ভাগ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো একেবারেই অচল।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলেন, ক্লিনিকের দায়িত্বে কমর্রত স্বাস্থ্য সেবদানকারী ব্যক্তিদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা একেবারে নাজুক হয়ে পড়েছে। সব যায়গায় ক্লিনিকগুলো ঠিকমত খুলছে না। ওষুধও তেমন দেই না।

এলাকাবাসীর দাবি বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় সফলতা হচ্ছে কমিউনিটি ক্লিনিক। সেটাকে ইচ্ছা করে কিছু কুচক্রি মহল নষ্ট করতে ষড়যন্ত্র করছে।

এদিকে রহনপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য মোঃ সাওন আলী বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিক বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আর সে সময় শুনছি অনেক ক্লিনিক বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি আরো বাড়ানো দরকার বলে আমি মনে করছি।

গোমস্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.মাসুদ পারভেজ জানান, আমাদের কাছে ওষুধ আসে তিন মাসে একবার কিন্তু এতে যা ওষধ আসে তা এক দেড় মাসেই শেষ হয়ে যায়। এজন্য আমরা সব সময় ওষুধ দিতে পারি না।

এবিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ডা. আব্দুস সালাম জানান, এমএলএস-এর ব্যাপারে এমন অভিযোগ ছিল। তবে ইনচার্জের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. জাহিদ নজরুল চৌধুরী জানান, এ বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না আপনি বললেন এখন অবগত হলাম তদন্ত করে ব্যবস্থা নিব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই ক্যাটাগরির আরও দেখুন